স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে আসছে নানা পরিকল্পনা

এ্যাকশন নিউজ ডেস্ক

পোস্ট এর সময় : ১১:২৪ অপরাহ্ণ, বৃহঃ, জুন ১৩, ২০১৯, ভিজিটর : ০

স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে আসছে বাজেটে বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা পেশ করা হয়েছে। লিখিত বাজেট বক্তৃতা বলা হয়, মানসম্মত স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং সবার জন্য স্বাস্থ্য ও গুণগত পরিবার পরিকল্পনা সেবা নিশ্চিত করে একটি স্বাস্থ্য সচেতন, সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার নিষ্ঠা ও একাগ্রতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে

এ খাতের উন্নয়নে বেশ কয়েকটি পরিকল্পনা প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করা হয়। সেগুলো হলো-

২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের জুন মেয়াদে এক লাখ ১৫ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় স্বাস্থ্য খাতে চতুর্থ স্বাস্থ্য জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে যার আওতায় মোট ২৯টি অপারেশনাল প্লানের মাধ্যমে সারাদেশে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা প্রদান ও চিকিৎসা শিক্ষার মানোন্নয়ন করা হচ্ছে। এসব কর্মসূচি সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাতে উন্নয়ন : মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধিসহ মাতৃ মৃত্যুহার, নবজাতকের মৃত্যুহার, অনূর্ধ্ব পাঁচ বছর বয়সী শিশু মৃত্যুহার, অপুষ্টি, খর্বতা ও কম ওজনের শিশুর জন্মহার হ্রাসসহ প্রভৃতি ক্ষেত্রে ক্রমাগত উন্নতি সাধিত হচ্ছে।

এছাড়া হবিগঞ্জ, নীলফামারী, নেত্রকোনা, মাগুরা ও নওগাঁ জেলায় মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত হোস্টেল নির্মাণ, মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্থাপন এবং প্রতিটি বিভাগীয় হাসপাতালে শিশু কার্ডিয়াক ইউনিট স্থাপনের জন্য প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ : স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণে সরকার যে সকল উল্লেখযোগ্য প্রকল্প গ্রহণ করেছে তার মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ, সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সকল জেলা সদর হাসপাতালে নেফ্রলজি ইউনিট ও কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপন এবং বিভাগীয় শহরে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যান্সার চিকিৎসায় ইউনিট স্থাপনের জন্য গৃহীত প্রকল্প।

মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যের উন্নয়ন : মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যের উন্নয়নের জন্য অগ্রাধিকারমূলক বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে মাতৃ স্বাস্থ্যের উন্নয়নের জন্য গৃহীত কার্যক্রমের মধ্যে অন্যতম হলো- চিকিৎসকদের জরুরি প্রসূতি সেবার ওপর প্রশিক্ষণ প্রদান মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কমিউনিটি বেজড অ্যাটেনডেন্ট প্রশিক্ষণ প্রদান, নিরাপদ সেবা প্রদান, গর্ভবতী মায়েদের সমন্বিত চিকিৎসা সেবা প্রদান, প্রাতিষ্ঠানিক সেবা গ্রহণ ও উৎসাহ প্রদান, মাতৃ স্বাস্থ্য ভাউচার স্কিম সম্প্রসারণ এবং সার্বিক ব্রেস্ট ক্যান্সার শনাক্তকরণ। অন্যদিকে নবজাতকের চিকিৎসা সেবা সম্প্রসারণের জন্য ১০টি জেলা হাসপাতাল ও ১০০টি উপজেলা হাসপাতালে স্পেশাল কেয়ার নিউবর্ন ইউনিট চালু করা হয়েছে। জনগণের ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে সরকার নয় হাজার ৭৯২ জন মেডিকেল অফিসার নিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা বিস্তৃতি : তৃণমূল পর্যায় থেকে বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করে বাংলাদেশ স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। গ্রামীণ জনগণকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক হলো প্রথম সেবা কেন্দ্র। বর্তমানে ১৩ হাজার ৭৭৯টি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু রয়েছে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৪০ জন করে রোগী সেবা গ্রহণ করে থাকেন, যার ৮০ শতাংশই নারী ও শিশু।

সারাদেশে প্রায় চার হাজার কমিউনিটি ক্লিনিকে স্বাভাবিক প্রসবসেবা দেয়া হচ্ছে। এছাড়া দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থিক ঝুঁকি হ্রাসে বর্তমানে টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতী, ঘাটাইল ও মধুপুর উপজেলায় স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচির পাইলট প্রকল্প চলমান রয়েছে।

চিকিৎসা শিক্ষা ব্যবস্থা আধুনিকায়ন : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আধুনিকায়নের লক্ষ্যে এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল নির্মাণ ও সান্ধ্যকালীন স্বাস্থ্যসেবা ভবন নির্মাণ করা হবে।

আগামী ২০১৯ ও ২০২০ অর্থবছরে উক্ত বিশ্ববিদ্যালয় একটি বিশ্বমানের বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট ইউনিট ও সাধারণ রোগীদের সেবার পরিধি বৃদ্ধির লক্ষ্যে অতিথি ভবন নির্মাণ ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা হবে।

এছাড়া এ খাতে আইন প্রণয়নের কাজ বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আগামী বছরগুলোতে সরকারি মেডিকেল কলেজ, ডেন্টাল কলেজ স্থাপন ও পরিচালনা আইন এবং বাংলাদেশ প্যারামেডিকেল শিক্ষা বোর্ড আইন প্রণয়নের উদ্যোগ চলমান রয়েছে।

অটিস্টিক ও বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা : অটিস্টিক অর্থাৎ বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন নাগরিককে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে তাদের চিকিৎসাসহ অন্যান্য সামাজিক সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। তারা যে সকল কর্ম সম্পাদনে পারদর্শী ও সক্ষম, সে কাজে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের কর্মক্ষম করে গড়ে তোলা হবে।

চিকিৎসা শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের সকল বিভাগে পর্যায়ক্রমে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতোমধ্যে কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

মাতৃ মৃত্যুহার কমানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তিন হাজার মিডওয়াইফ পদ সৃজন করা হয়েছে। ২০১৮ সালে পাঁচ হাজার ১০০ সিনিয়র স্টাফ নার্স নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নার্সিং শিক্ষা সম্প্রসারণে আগামী অর্থবছরে তিনটি নার্সিং কলেজ ও পাঁচটি নার্সিং বয়েজ হোস্টেল স্থাপন করা হবে।

বিজ্ঞানের নতুন নতুন উদ্ভাবন ও উচ্চ প্রযুক্তির ব্যবহার করে চিকিৎসা ব্যবস্থা আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ফেলোশিপ অনুদান প্রদানসহ বিভিন্নমুখী কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।
বিগত ১০ বছরে সারাদেশে মেডিকেল কলেজের সংখ্যা এবং এমবিবিএস কোর্সের আসন সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশে মেডিকেল কলেজের সংখ্যা ২০০৬ সালে ৪৬টি হতে বর্তমানে ১১১টিতে উন্নীত হয়েছে। একইভাবে এমবিবিএস কোর্সের আসন সংখ্যা ২০০৬ সালে দুই হাজার ৫০টি থেকে ২০১৮ সালে ১০ হাজার ৩০০টিতে বৃদ্ধি করা হয়েছে।

বিজ্ঞান ভিত্তিক চিকিৎসা প্রসার : বিজ্ঞান ভিত্তিক চিকিৎসা ব্যবস্থা উদ্ভাবন ও প্রসারের জন্য সরকারি উদ্যোগ রয়েছে। যেমন- ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের লক্ষ্যে সাভারের তিনটি অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি বিশিষ্ট নিউক্লিয়ার মেডিকেল ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া পাঁচটি অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউট অব ব্যাংকিং অ্যান্ড বায়োম্যাটেরিয়ালস স্থাপন করা হয়েছে।

নবজাতকের মধ্যে জন্মগত হাইপো থাইরয়েড রোগের প্রাদুর্ভাব শনাক্তকরণের জন্য ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যাপ্লাইড সাইন্স, ঢাকায় নিউবর্ন স্ক্রিনিং সেন্ট্রাল ল্যাবরেটরি স্থাপন এবং কক্সবাজারে পরমাণু চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া মিটফোর্ড, কুমিল্লা ফরিদপুর, বগুড়া, বরিশাল, খুলনা, ময়মনসিংহ ও রংপুরের পরমাণু চিকিৎসা কেন্দ্রে গবেষণা ও চিকিৎসা সেবা সম্প্রসারণ এবং আধুনিকায়ন করা হয়েছে।

বিসিএসআইআর এ ভ্রাম্যমাণ গবেষণাগার বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত তথ্য গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন ও ফলিত শিল্প গবেষণা ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা করা হবে। আগামী অর্থবছরে দেশের আটটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ক্যাম্পাসে ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যাপ্লাইড সাইন্স স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি বিদ্যমান ছয়টি ইনস্টিটিউটের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি : শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের সুফল দেখা যাচ্ছে সামাজিক খাতের বিভিন্ন সূচকে। এখানে বাংলাদেশ ব্যাপক অগ্রগতি সাধন করতে পেরেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রত্যাশিত গড় আয়ুষ্কাল ৭২ দশমিক ৮ বছর, অন্যদিকে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যুহার প্রতি হাজারে ৩১ জন, এক বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুহার ২৪ জন এবং মাতৃ মৃত্যুহার প্রতি হাজারে ১ দশমিক ৭২ জনে নেমে এসেছে।

সরকারের এই অভূতপূর্ব সাফল্যের প্রতিফলন ঘটেছে বিশ্বব্যাংকের নতুন হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনডেক্স ২০১৮ তে। যাতে ১৫৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান হয়েছে ১০৬তম। এই অগ্রযাত্রা বজায় রাখার জন্য আগামী অর্থবছরের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *