সময়ে এক ফোঁড় অসময়ে দশ ফোঁড়

এ্যাকশন নিউজ ডেস্ক

পোস্ট এর সময় : ১:২৩ অপরাহ্ণ, বৃহঃ, আগ ৮, ২০১৯, ভিজিটর : ০

ঠিক সময়ে সঠিক কাজটি অবহেলাবশত না করলে যে ক্ষতি হয়, পরে অসময়ে অনেক চেষ্টা করেও সে ক্ষতি পূরণ সম্ভব নয়। সে জন্যই আমাদের প্রাচীনকালের জ্ঞানীরা বলেছেন: সময়ে এক ফোঁড় অসময়ে দশ ফোঁড়। কোনো জনপদে রোগবালাই বলেকয়ে আসে না। তবে যদি কোনো রোগ হয় সাংবৎসরিক ও মৌসুমি, সে সম্পর্কে একটা আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। শ্রাবণ-ভাদ্র-আশ্বিন মাসে বাংলাদেশে কমবেশি ভাইরাল ফিভার ও ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ দেখা দেয়। কোনো কোনো বছর কম, কোনো বছর খুব বেশি। পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত আমরা দেখেছি চৈত্র-বৈশাখ মাসে গুটিবসন্ত এবং আশ্বিন-কার্তিক মাসে কলেরায় গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যেত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সরকারের চেষ্টায় সেই বালাই থেকে মুক্তি পাওয়া গেছে।

প্লেগের মতো ভয়াবহ সংক্রামক রোগও এই উপমহাদেশে দেখা দিয়েছিল। ১৮৯৬ সালের শেষের দিকে বোম্বে (মুম্বাই), পুনেসহ মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে প্লেগ মহামারির আকারে ছড়িয়ে পড়ে। ‘মহারাষ্ট্রে প্রায় ৫০,০০০ মানুষ প্লেগে মারা যায়।’ [ভারতী, বৈশাখ ১৩০৬] চিকিৎসার আধুনিক ব্যবস্থা, ওষুধপথ্য এখনকার মতো সেকালে ছিল না। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরোধের ব্যবস্থা করে। তা না করলে উপমহাদেশে কয়েক কোটি মানুষ মারা যেত। কলকাতায়ও প্লেগ এসেছিল। বিত্তবানেরা নৌকায় গঙ্গায় গিয়ে থাকতেন। কয়েক মাসের মধ্যে সরকার ‘প্লেগ রেগুলেশন’ আইন করে ১৮৯৭-এর ফেব্রুয়ারিতে। একটি ‘প্লেগ কমিটি’ করা হয়েছিল ডব্লিউ সি রিডকে সভাপতি করে। সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল সংক্রামক রোগটি যাতে ছড়িয়ে না পড়ে। ‘প্লেগ রেগুলেশন’-এর বিধিতে ছিল যেকোনো নাগরিকের বাড়ির ভেতরে ঢুকে প্লেগের রোগী আছে কি না, তা দেখতে পারবে এবং তাকে সরিয়ে নিতে পারবে হাসপাতালে।

প্লেগ সংক্রামক রোগ, তার জীবাণু ছড়ায় ইঁদুর থেকে। মানুষের বাড়িঘর দোকানপাটের আবর্জনার মধ্যে থাকে ইঁদুর। তাই প্লেগ প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতার ওপর সরকার জোর দেয়। মুম্বাই নগরীর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লোকেরা বাড়িঘর হাটবাজারের দোকানপাটে হানা দিতে থাকেন। রাজনৈতিক নেতারা একটা ইস্যু পেয়ে যান। বালগঙ্গাধর তিলক এই আইনের প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু করেন। সন্ত্রাসবাদীরাও একটা কাজ পান। প্লেগ কমিটির চেয়ারম্যান রিড এবং তাঁর সহকারী ক্যাপ্টেন আয়ের্স্টকে (Ayerst) প্রকাশ্য রাজপথে গুলি করে হত্যা করে। উপমহাদেশ উত্তাল হয়ে ওঠে।

সব ব্যাপারে সরকারকে দোষ দেওয়া যায় না। রক্ষণশীল ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে সমস্যা নানা রকম। ‘পরিচ্ছন্নতা রক্ষা ও প্লেগ রোগীকে পৃথক্‌করণ কর্মসূচি’তে ভদ্রলোকদের থেকে বাধা আসে। ‘উচ্চবর্ণের হিন্দুদের পারিবারিক সম্ভ্রমবোধ ক্ষুণ্ন’ করায় তাঁরা বাড়িঘর তল্লাশিতে বাধা দেন। সম্ভ্রান্ত মুসলমানরা আরও বেশি পর্দানশিন। তাঁরাও ঘোর আপত্তি তোলেন। ইংরেজ সরকার, গোরা সৈন্য ও পুলিশের হাতে থাকত হান্টার। তারা দেখেছে জীবন আগে, পর্দা পরে। পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালিয়ে প্লেগ প্রতিরোধ সম্ভব হয়েছিল। তখন এত মিডিয়াও ছিল না। প্রচারের জন্য কর্মকর্তারা লালায়িতও ছিলেন না। ব্রিটিশ কর্মকর্তারা বাচালতা অপছন্দ করেন, নীরবে কাজ করেন। তাঁদের তৎপরতায় প্লেগ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারেনি। হান্টারের ভয়ে নাগরিকেরা নিজেরাই ইঁদুরের আস্তানা ধ্বংস করে।

স্বাধীন দেশে হান্টার এস্তেমাল সমর্থনযোগ্য নয়। সেটা করতে গিয়ে ১২২ বছর আগে মি. রিড নিহত হন, এখন হবে রিট। সেকালের মানুষের সংস্কার ও চেতনার মান আর এখনকার মানুষের চেতনার মান সমানও নয়। বাংলাদেশের নগর-বন্দর ও সমস্ত জনপথ আজ ‘নির্বাচিত’ জনপ্রতিনিধিতে গিজগিজ করছে। টেলিভিশনের কারণে ‘মেয়র’ শব্দটির সঙ্গে দেশের মানুষ অতি পরিচিত। কিন্তু ঢাকা মহানগরীতেই যে শ দেড়েক কাউন্সিলর রয়েছেন, তা ৯৫ শতাংশ মানুষ জানেন না। তাঁদের রক্তসম্পর্কের জ্ঞাতি এবং শ্বশুরবাড়ির আত্মীয় ছাড়া নগরবাসী তাঁদের দর্শন পায় না। অথচ পঞ্চাশ ও ষাটের দশকেও এই নগরীতে একজন কাউন্সিলরকে অলিগলি ঘুরে মানুষের খোঁজখবর নিতে দেখেছি।

সরকারি কর্মকর্তাদের দোষারোপ করে একহাত নেওয়া বাঙালির আড়াই শ বছরের অভ্যাস। অথচ তাঁরা কী করেন, তার খোঁজ সব সময় না নিয়েই তাঁদের সমালোচনা করা হয়। ওদিকে রাজনীতিকরনেওয়ালারা গলাবাজি করে দায়িত্ব শেষ করেন। ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া মোকাবিলার অভিজ্ঞতা আমাদের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের রয়েছে। তাঁরা মাস চারেক আগেই এবারে ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে—এমনটি আশঙ্কা করে সরকারকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তাদের নিয়ে তাঁরা সভা করেছেন। নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে আমাকে ডেকেছেন। আমিও তাঁদের অনেক সভায় গিয়েছি। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সতর্কতাকে মন্ত্রণালয় তথা মন্ত্রী মূল্য দেননি। ঢাকা উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম মশা নিধনের কীটনাশক নিয়ে সভা করেছেন। কার্যকর কীটনাশক আমদানির উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে অগ্রগতি বিশেষ নেই।

আমরা চেয়েছিলাম সরকার ডেঙ্গু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করুক। দুই মাস আগেই যদি দেশের বিভিন্ন মেডিকেল হাসপাতাল, সদর হাসপাতালের ডাক্তারদের এ সম্পর্কে প্রস্তুতি নিতে বলা হতো, তা হলে মানুষের ভোগান্তি কম হতো। বাস্তবতাকে অস্বীকার করে সরকারের দুই পয়সা লাভ হয় নাই। রোগবালাই মহামারির আকারে দেখা দিতেই পারে। তাতে কারও হাত নেই। মহামারির জন্য সরকারকে দায়ী করা যায় না, তা প্রতিরোধে ও দমনে ব্যর্থতার জন্য সরকারকেই মানুষ দায়ী করবে।

নব্বইয়ের দশক থেকে জাতিসংঘ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বাংলাদেশসহ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নতুন নতুন ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটবে। বিশেষ করে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়া, কালাজ্বর প্রভৃতি। আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে জোরালো ব্যবস্থা নিয়েছে তেমন প্রমাণ নেই। মন্ত্রণালয় পদায়ন, নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, বিদেশ সফর প্রভৃতি দাপ্তরিক কাজ নিয়ে ব্যস্ত। খুব বেশি আগ্রহ নতুন ভবন নির্মাণ ও কেনাকাটা নিয়ে। চিকিৎসার যন্ত্রপাতি অতি আগ্রহে কেনা হচ্ছে, তা কে ব্যবহার করবে, কেউ জানে না। সেগুলো পড়ে থেকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

এবার ডেঙ্গু নিয়ে যখন পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হচ্ছিল, অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা যখন সভা করছিলেন, তখনই মন্ত্রণালয়ের উচিত ছিল দেশের সব মেডিকেল কলেজের পরিচালক ও প্রিন্সিপালদের নিয়ে আলোচনা করে সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলার আগাম ব্যবস্থা নেওয়া। পত্রপত্রিকার রিপোর্টকে তাচ্ছিল্য ও বিদ্রূপ করা হলো। তখনই যদি ঢাকার বাইরের মেডিকেল হাসপাতালের ডাক্তার, সদর হাসপাতালের আরএমও, মেডিকেল কনসালট্যান্টদের এনে ম্যানেজমেন্ট ট্রেনিং দেওয়া হতো, আজ মানুষের এত ভোগান্তি হতো না। এখনো দায়িত্বপ্রাপ্তরা মুখে এমন সব কথা বলছেন, তা চায়ের আড্ডায় বলা যায়, রাষ্ট্রের পাবলিক অনুষ্ঠানে নয়।

ঢাকার বাইরে জেলায় ও উপজেলায় হাজার হাজার ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে না, কারণ উপযুক্ত ডাক্তার নাই, ওষুধ নাই, যন্ত্রপাতি নাই অথচ অতি সুন্দর হাসপাতাল কমপ্লেক্স রয়েছে। জেলা সদর ও উপজেলা হাসপাতালে যদি স্বাভাবিক চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকত, তাহলে এই ধরনের মাঝারি মহামারিতে মানুষকে ঘাবড়াতে হতো না। কিন্তু বেদনার বিষয়, সরকার টাকা খরচ করছে দেদার, মানুষ উপকার পাচ্ছে না।

বর্তমানের খারাপ অবস্থার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে আরও বড় কোনো দুর্যোগ কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, সে চেষ্টাই হবে দূরদর্শী কাজ। উন্নত ও জ্ঞানপিপাসু জাতি তাই করে। তারা পরিস্থিতি নিয়ে গবেষণা করে এবং অভিজ্ঞতা ও গবেষণালব্ধ ফলাফল নীতিনির্ধারকদের কাছে পেশ করে। যদি আগামী বছরগুলোতে এর চেয়েও বড় বিপদ আসে, বিপন্ন মানুষদের জন্য রাষ্ট্র কিছুই করতে পারবে না। কেউ মরবে, অগণিত ভুগে ভুগে কোনোমতে বেঁচে থাকবে। কাজেই সময়ে এক ফোঁড়ই অনেক কাজে আসে।


সৈয়দ আবুল মকসুদ লেখক ও গবেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *